নেপাল-তিব্বত সীমান্ত মৃত্যুপুরী: ৩৫৯ মরদেহ উদ্ধার: নিখোঁজ ১৩০০
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 27 Aug, 2026
হিমালয়ের কোলঘেঁষা নেপাল ও চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বত সীমান্তে প্রকৃতির আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক রূপ প্রত্যক্ষ করল বিশ্ব।
নেপাল-চীন সীমান্ত বরাবর তিব্বত অংশের একটি বিশালাকার হিমবাহ ভেঙে পড়ে পাথুরে ধ্বংসাবশেষের সাথে আছড়ে পড়ার ফলে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যায় তছনছ হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জনপদ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) নিশ্চিত করেছে, কোনো ভূমিকম্প নয়—বরং অত্যন্ত শক্তিশালী হিমবাহ ধস ও তীব্র কাদার স্রোতের (debris flow) কারণেই নিম্নাঞ্চলে এই নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে আসে, যার গতি ও কম্পন ৫.২ মাত্রার ভূকম্পনের সমতুল্য প্রভাব সৃষ্টি করে।
তিব্বতের লেন্দে নদী ও নেপালের ভোতে কোশী হয়ে নেমে আসা পানির দানবীয় স্রোতে নদী তীরবর্তী গ্রাম, সড়ক, নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সেতু মুহূর্তেই বিলীন হয়ে গেছে।
সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৯ জনে। দেশটির রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, গোর্খা, তানাহুন এবং নওয়ালপরাসী জেলা থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; যার মধ্যে চিতওয়ানেই পাওয়া গেছে ১৩২টি মরদেহ।
অন্যদিকে তিব্বত অংশে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশ মিলিয়ে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ। নিখোঁজদের একটি বড় অংশই বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী, যাঁরা মাউন্ট কৈলাশসহ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণে ছিলেন। এদের মধ্যে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রয়েছেন।
নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে নেপালের সেনা ও পুলিশ বাহিনীর বহু সদস্যও।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) জানিয়েছে, এই দুর্যোগে কেবল নেপালের তিনটি জেলাতেই ১৭ হাজারের বেশি শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পানিতে ভেসে কিংবা ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে প্রাণ গেছে অন্তত ১৪ জন শিশুর। সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, যেসব শিশু ও পরিবার বেঁচে গেছে, তারাও এখন তীব্র খাদ্যসংকট, বাসস্থানহীনতা ও পানিবাহিত রোগের চরম ঝুঁকিতে দিনাতিপাত করছে।
সংকট মোকাবেলায় সংস্থাটি জরুরি ভিত্তিতে ১ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে দুর্যোগ কবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজে নেমেছে নেপালি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বল ও স্থানীয় প্রশাসনসহ ১৩ হাজারের বেশি নিরাপত্তা সদস্য। নুওয়াকোটের মৈথলী সেনা ব্যারাককে মূল কেন্দ্র বানিয়ে দফায় দফায় হেলিকপ্টার অভিযানের মাধ্যমে শত শত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া, প্রধান প্রধান মহাসড়কে ভূমিধসের ফলে যান চলাচল বন্ধ হওয়া এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকাজ চরম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে স্বজনদের তালিকা তৈরির মতো ন্যূনতম কাজও করতে হচ্ছে মুঠোফোনের আলোয়।
আন্তর্জাতিকভাবে এই মানবিক সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ; যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদান ঘোষণা করেছে এবং ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস প্রাণহানিতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
উদ্ধার তৎপরতার মাঝেই নতুন করে তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় দফা বন্যার চরম আতঙ্ক। উপগ্রহ তথ্যে দেখা গেছে, ভূমিধসের কারণে ভোতে কোশী নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে উজানে একটি সুবিশাল অস্থায়ী কৃত্রিম হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টির ফলে হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এবং এটি ফেটে গেলে ভাটি অঞ্চলে আরও বড় ধরণের প্লাবন আঘাত হানতে পারে।
ফলে নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলো খালি করে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
কাদার নিচে চাপা পড়া প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা আর নতুন বন্যার আশঙ্কার দোলাচলে হিমালয়জুড়ে এখন কেবলই হাহাকার আর ধ্বংসের স্তূপ।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

